ঢালিউডের জন্য ২০১৭ সাল ব্যবসায়িকভাবে সুবিধাজনক ছিল না। কয়েকবছরের মন্দার ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। আশার দিক হলো— এ বছরে চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন ভাবনা ও নির্মাণের ধারাবাহিকতা বেড়েছে। এছাড়াও দর্শকের আগ্রহ ছিল চোখে পড়ার মতো।

২০১৮ সাল জুড়ে নানান স্বাদের সিনেমা মুক্তি পেয়েছে ঢালিউডে। সেই সাথে সিনেমা হলে দর্শকদের ভীড় ও আগ্রহ এদেশের পরিচালকদের মনে তৈরি করেছে নতুন আশার সঞ্চার। আমাদের “ফিরে দেখাঃ ২০১৮” এ আজকের পর্বের আয়োজন এ বছরের সেরা বাংলা মুভিগুলো নিয়ে।

স্বপ্নজাল 

গিয়াসউদ্দিন সেলিম ২০০৯ সালে প্রথম ছবি ‘মনপুরা’ দিয়ে আলোচনা তুলেছিলেন। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম ব্যবসাসফল ছবিও এটি। তার ৯ বছর পর এ বছর মুক্তি পেল ‘স্বপ্নজাল’। প্রধান দুই চরিত্রে আছেন পরী মনি ও ইয়াশ রোহান। ৯ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পেয়েছে ‌‘স্বপ্নজাল’।

কাহিনি শুরু হয় নদীমাতৃক বাংলাদেশের একটি অঞ্চল চাঁদপুর থেকে। মাছ কেনা-বেচা নিয়ে দুজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই এক সময় এতটা প্রবল রূপ নেয় যে, সেখানে হত্যাকাণ্ড সংঘঠিত হয়। সবার অগোচরে মেরে ফেলা হয় সনাতন ধর্মের অনুসারী হিরণ সাহা চরিত্রের মিশা সওদাগরকে। তার পরিবারের কাছে জানানো হয় তিনি ভারতের কলকাতাতে চলে গিয়েছেন আবার বিয়ে করে। হিরণ সাহার মেয়ে শুভ্রা ও পরিবার উপয়ান্তর না দেখে পাড়ি দেয় কলকাতাতে।

প্নজালের সবচেয়ে দুর্দান্ত দিক কোনটি—এমন প্রশ্ন হাজির হতেই পারে। বলা যায়, ধর্মকে যেভাবে ডিল করেছেন পরিচালক তা এককথায় দুর্দান্ত। প্রেমের ফাঁকে ধর্মকে যেভাবে জায়গা দিয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ে সমাজব্যবস্থায় প্রেম ভালোবাসার স্থান নেই, সে বিষয়টি পরিচালক যেভাবে পর্দায় দেখালেন তা সত্যিই অসাধারণ। আরেকটি বিষয় হলো, এদেশের হিন্দুরা যেভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে দেশান্তরিত হন কিংবা তাদের দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য করে একশ্রেণির প্রভাবশালী মহল–সেই বিষয়টি ফ্রেমে তুলে এনেছেন পরিচালক।

পুরো সিনেমা বিবেচনা করলে নির্মাণগত দিক থেকে মোটামুটি ভালো সিনেমা বলা যায়। আপনার সময় নষ্ট হয়েছে একথা মাথায় আসবে না, এটি ‘স্বপ্নজাল’র শতভুলের পরও সব থেকে বড়প্রাপ্তি।

পোড়ামন  

২০১৩ সালে মুক্তি পাওয়া জাকির হোসেন রাজুর ‘পোড়ামন’র সিক্যুয়াল পোড়ামন ২  রায়হান রাফির পরিচালনায় অভিনয় করেছেন সিয়াম আহমেদ ও পূজা চেরিআমাদের গ্রাম বাংলার চিরায়ত সত্য, সরল, সুন্দর একটি নির্মল প্রেমের গল্প “পোড়ামন ২”। নান্দনিক কোন প্রকাশ ভঙ্গি নেই এ ছবিতে। আছে বেদনা বিধুর দুটি প্রাণের সঞ্চার। মৃত্যুকে উপেক্ষা করে অর্থ-বিত্ত, প্রাচুর্য যখন জীবনে প্রয়োজন হয় না,যুগ যুগ ধরে প্রেম এখানে মুখ্য। তবে প্রেমের ব্যাখ্যায় বিচ্ছেদই যখন জয়ী হয় তখন নীল কষ্টে পুরো গ্রাম ছেয়ে যায়। পরিচালক ছবিটিতে এমন ঘটনা দেখিয়েছেন তা সত্যি শরীর ও মনে পোড়া গন্ধ হয়।

ছবির পজিটিভ সাইড বলতে গেলে প্রথমেই আসবে বাণিজ্যিক মুভির ফ্রেমে ফ্রেমে শৈল্পিক সৌন্দর্য্য!মনেই হয় রায়হান রাফি প্রথমবারের মত সিনেমা পরিচালনা করেছেন। প্ৰশংসনীয় ছিল সিয়ামের অভিনয়। সিয়াম পরীর কেমিস্ট্রি দর্শক খুব পছন্দ করেছে। ক্যামেরার কাজ, স্পেশালি ড্রোন শট বেশ ভালো ছিল। আর এ মুভির গানগুলো ছিল অসাধারন।

পোড়ামন ২ ছবিটি কষ্টে নীল হবার গল্প শোনায়। এক স্বপ্নতুর দুটি মানুষের গল্প। অভিনয়, সংলাপ, নাচ -গান, ক্লাইমেক্স সব ছিল এ ছবিতে। একটি লোক প্রেম কাহিনী নির্ভর ছবি “পোড়ামন ২” ছবিটি বাণিজ্যিক ছবি হিসেবে সফল।

দেবী 

হুমায়ূন আহমেদের একই নামের জনপ্রিয় উপন্যাস অবলম্বনে ছবিটি নির্মিত হচ্ছে। পরিচালনায় আছেন আনম বিশ্বাস। সহ-প্রযোজনায় অভিনেত্রী জয়া আহসানের প্রতিষ্ঠান ‘সি তে সিনেমা’। এর মাধ্যমে বড়পর্দায় অভিষেক হচ্ছে আইকনিক চরিত্র মিসির আলীর। এ চরিত্রে আছেন চঞ্চল চৌধুরী ও রানু চরিত্রে জয়া। রানুর স্বামী আনিস চরিত্র করছেন অনিমেষ বিশ্বাস। আরো আছেন শবনম ফারিয়া।

যেই মিসির আলীকে বইয়ে পড়ে মন্ত্রমুগ্ধের মত কল্পনা করতাম, তিনি এখন রঙিন পর্দায় আমাদের সামনে। বইয়ের পাতায় লোকটার মাথায় অবিন্যস্ত চুল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। কিন্তু দৃষ্টি এত প্রখর যে তাকালে মনে হবে সামনে যিনি আছেন, তাঁর ভেতরটা পড়তে পারছেন। ইনিই মিসির আলি। এ খবরও নিশ্চয়ই বেশির ভাগ মানুষ জেনে গেছেন, নতুন মিসির আলি হয়েছেন চঞ্চল চৌধুরী। মনপুরা, মনের মানুষ, আয়নাবাজির চঞ্চল চৌধুরী।

রাজধানীর সিনেমা হলগুলোতে ছিলো ‘দেবী’র জয়জয়কার। প্রতিটি সিনেমা হলেই ছিলো দর্শকদের উপচে পড়া ভীড়। শুরুতেই এমন অবিশ্বাস্য সাড়া এর আগে কোনো সিনেমা পায়নি। এখনো অনেক সিনেমা হলেই চলছে ছবিটি।

নূর জাহান

বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এ বছর মুক্তি পাওয়া একমাত্র ছবি ‘নূর জাহান’। বাংলাদেশ ভারতের যৌথ প্রযোজনায় মুক্তি পাওয়া ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন নবাগত ওপার বাংলার অদ্রিত রায় ও বাংলাদেশের পূজা চেরি।

প্রচলিত বাংলা বাণিজ্যিক ধারার ছবি বলতে যা বোঝায় ‘নূর জাহান’ সেই ধাঁচের ছবি। তাই এই ছবিটি থেকে শিক্ষণীয় কিছু না পেলেও পরিপূর্ণ বিনোদন পাবেন দর্শক। রোমান্স, রাজনৈতিক কলহ, পারিবারিক টানাপড়েন, ট্রাজিডি সব কিছুর কম্বো পাবেন দর্শক।

 

ছবিতে সব মিলিয়ে মাত্র তিনটি গান ব্যবহার করা হয়েছে। কম হলেও তিনটি গানই শ্রুতিমধুর লেগেছে। সেই সাথে আবহসঙ্গীতও ভালো ছিল। ক্যামেরার কাজ বেশ ছিল। তবে ফ্রেমিং এর ক্ষেত্রে আরেকটু যত্নশীল হলে ভালো হত। যেহেতু এটি যৌথ প্রযোজনার ছবি সেহেতু সবার আকাঙ্ক্ষাও বেশী ছিল ছবিটি নিয়ে। যারা নিছক প্রেমের গল্প পছন্দ করেন, যারা সিনেমায় নির্মল বিনোদন খোঁজেন ‘নূর জাহান’ তাদের জন্য একটি আদর্শ সিনেমা।

SHARE

LEAVE A REPLY